ম্যানগ্রোভ আর সাগরের সমতলে দেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালী
শেয়ার করুন
ফলো করুন

কোথাও ঘুরতে যাব বললেই আমাদের মধ্যে অনেকেই কী এক কারণে দেশের বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা করে ফেলি অবচেতন মনে। অনেকের মুখেই শোনা যায়, বাংলাদেশে আবার দেখার কিছু আছে নাকি! যাঁরা এমন ভাবেন বা চিন্তা করেন, তাঁদের জন্য ভ্রান্ত ধারণা দূর করতেই হাল ফ্যাশনের বেড়ানো অংশে ভিন্ন এবং অন্য রকম গন্তব্যের সন্ধান দেওয়া থাকে সব সময়। আজকের পর্বে রয়েছে মহেশখালীর গল্প।

পাহাড়, সমুদ্র আর ম্যানগ্রোভ—প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের এই ত্রয়ী সম্মিলন রয়েছে বাংলাদেশেরই এক দ্বীপে। এর ইতিহাস নিয়ে রয়েছে রীতিমতো মার্ভেল বা ডিসি মুভির মতো গল্প আর সেই সঙ্গে এর নামকরণের কাহিনিতে রয়েছে মিথোলজির ছোঁয়া। মহেশখালী বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ। আর সেই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল দ্বীপও।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা এটি। মহেশখালী তিনটি ছোট ছোট দ্বীপের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে যাদের নাম সোনাদিয়া, মাতারবাড়ী ও ধলঘাটা। জনশ্রুতি আছে, বহু বছর আগে নুর মোহাম্মদ শিকদার নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি মাঝেমধ্যেই পাহাড়ে হরিণ শিকার করতে যেতেন। একদিন শিকারে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে গাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন তিনি।

হুট করেই একটা শব্দে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। তিনি দেখতে পান, কিছুদিন আগে তাঁর গোয়ালঘর থেকে হারিয়ে যাওয়া একটি গাভি একটা পাথরের ওপর তার বাট থেকে দুধ ঢালছে। এরপর তিনি সেই গাভি ও পাথর নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। রাতে স্বপ্নে দেখেন, কোনো এক মহাপুরুষ তাঁকে বলছেন, এই পাথর যেখানে পেয়েছেন, সেখানে পাথরটি রেখে একটি মন্দির নির্মাণ করতে এবং সেই মন্দিরের নাম হবে আদিনাথের মন্দির।

আদিনাথ বা শিবের ১০৮টি নামের মধ্যে ‘মহেশ’ একটি। সেই থেকেই এই দ্বীপের নাম মহেশখালী হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এ ছাড়া এ-ও বলা হয়ে থাকে, ২০০ বছর আগে বৌদ্ধ সেন মহেশ্বরের নামানুসারে এর নাম হয় মহেশখালী।

বিজ্ঞাপন

১৫৫৯ সালে প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই দ্বীপের সৃষ্টি হয়। একজন পর্তুগিজ ভ্রমণকারী আরাকান অঞ্চলে এই প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের বিবরণ লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন। দ্বীপের পূর্ব প্রান্ত দিয়ে উত্তর-দক্ষিণমুখী পাহাড় ও তার পাদদেশে প্রবাহিত চ্যানেল থাকার কারণে ধারণা করা যায় যে দ্বীপটি একসময় মূল ভূখণ্ড কক্সবাজারের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সুনীতি ভূষণ কানুনগো তাঁর লেখা ‘চট্টগ্রামে মগশাসন’ বইয়ে উল্লেখ করেন, ১৫৮০ সালে দক্ষিণ চট্টগ্রামে আরাকানি শাসন শুরু হলে মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা থাকার কারণে মহেশখালী দ্বীপের ওপর শাসকগোষ্ঠীর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। এখানে একটি সংঘবদ্ধ জলদস্যুদের আবাসস্থল গড়ে ওঠে বলে তাঁর বই থেকে জানা যায়। এ দ্বীপ শুঁটকি, চিংড়ি, মুক্তা ও লবণ চাষের জন্য প্রসিদ্ধ হলেও মহেশখালীর পান সারা দেশে জনপ্রিয়।

মহেশখালী যেতে হলে আপনাকে ঢাকা বা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে যেতে হবে কক্সবাজার। সেখান থেকে মহেশখালীর দূরত্ব মাত্র ১২ কিলোমিটার। কক্সবাজার ৬ নম্বর ঘাট থেকে স্পিডবোটে করে মহেশখালী যেতে মাত্র ২০ মিনিট সময় লাগে। বাঁকখালী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় এর অবস্থান। বোটে যেতে যেতে হুট করেই দেখবেন একটা চ্যানেল পার হয়ে দুই পাশের বৃক্ষের সাম্রাজ্যের মাঝখান দিয়ে ভেসে যাচ্ছেন আপনি। বোট ১ নম্বর জেটি ঘাটে নামাবে।

এখান থেকে অটোরিকশা রিজার্ভ করে দুই পাশের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ শ্বাসমূলযুক্ত গাছের ম্যানগ্রোভ বনের মধ্য দিয়ে যখন যাবেন, এক দারুণ রোমাঞ্চ অনুভব করবেন নিঃসন্দেহে। এখানে দেখার মতো রয়েছে বৌদ্ধবিহার, জলে ডোবা বন, বিভিন্ন বন্য প্রাণী, মৈনাক পর্বতের ওপর আদিনাথ মন্দির, রাখাইনপাড়া, স্বর্ণমন্দির, বৌদ্ধ কেয়াং আর সোনাদিয়া দ্বীপ। এখানে প্রতি ফাগুন মাসে আদিনাথের মেলা হয়।

এ ছাড়া পাহাড়ের মাঝে খুম রয়েছে যা অফট্রেইল ধরনের। খুব বেশি পর্যটক এখানে আসেন না। রোমাঞ্চপ্রিয় কেউ যদি ঘুরে দেখতে চান এই জায়গা, চাইলে তাঁবুতে থাকতে পারেন এখানে। এখানে বড় বৌদ্ধমন্দিরে দেখা পাওয়া যায় আধ শোয়া, ধ্যানমগ্ন ও দণ্ডায়মান সুন্দর কারুকার্যের বৌদ্ধমূর্তি। এই পথেই পাবেন সারি সারি পানের বরজ। এরপর রয়েছে স্বর্ণমন্দিরের স্বর্ণমূর্তি। আবার সেখান থেকে চলে যেতে পারেন আদিনাথ মন্দিরে। এখানে ৬৭টি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮৫ মিটার ওপরে অবস্থিত। এ জায়গায় ৫০০ থেকে ৬০০ বছরের পুরোনো প্যাগোডা দেখা যায়।

মূল মন্দির থেকে আরেকটা পথে ট্র্যাকিং করে গেলেই আদি মন্দির দেখা যায়। সেখান থেকে পুরো ম্যানগ্রোভের বন, বঙ্গোপসাগর আর পানের বরজের প্যানারোমিক ভিউ নিঃসন্দেহে মুগ্ধ করবে আপনাকে। এ ছাড়া শুটিং ব্রিজ নামের দারুণ একটি ব্রিজ রয়েছে সেখানে। এই ব্রিজ থেকে নেমে আপনি চলে যেতে পারেন ঝাউবাগান ও চরপাড়া সৈকতে। যেতে যেতে দুই পাশে পাবেন গোলপাতা, সুন্দরীগাছের বন আর সেই সঙ্গে পথেই দেখতে পাবেন পানের বরজ ও লবণের মাঠ।

এ ছাড়া আছে সোনাদিয়া দ্বীপ ও সমুদ্রসৈকত, ধলঘাটা হাঁসের চর ও শরইতলা সি বিচ। আছে প্যারাবন, চিংড়িঘের। মুদির ছড়ায় রয়েছে  ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট, রাখাইন ছড়া ও রাখাইন বৌদ্ধমন্দির, মুদির ছড়ার বটগাছ, গোরকঘাটা জমিদারবাড়ি, মাতারবাড়ী সমুদ্রসৈকত।

এখানে থাকা-খাওয়ার খুব একটা সুব্যবস্থা নেই বলে আপনি চাইলে কক্সবাজারে ফিরে যেকোনো হোটেলে থাকতে পারেন এবং খাওয়াদাওয়া সারতে পারেন। তবে যদি অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী হয়ে থাকেন, তবে তাঁবুবাস করে দ্বীপের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তাঁদের বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকতে পারেন। আর স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে থেকে তাঁদের আচার-সংস্কৃতি দেখা ও তাঁদের নিজস্ব খাবার খাওয়ার মধ্যে একটা আনন্দ তো থাকবেই।

ছবি: মালেক খসরু ঊষা

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৮: ০০
বিজ্ঞাপন