যে মসজিদের স্থাপত্য আপনাকে ফিরিয়ে নেবে সুলতানি আমলে
শেয়ার করুন
ফলো করুন

নবী (সা.)–এর স্মৃতিবিজড়িত শহর তায়েফে জন্ম বাবা আদমের—১০৯৯ সালে। মক্কা থেকে হিজরত করে আসেন বাগদাদে। ধর্ম প্রচারে বের হন হেঁটে। একাদশ শতাব্দীতে চলে আসেন তৎকালীন বাংলায়। বাংলার সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি তাঁকে মুগ্ধ করে। আপ্লুত হন মানুষের সরলতায়। ফলে থেকে যান এখানেই। বসত গড়েন বাংলার সমৃদ্ধ অঞ্চল বিক্রমপুরে।  

বাবা আদম মসজিদ
বাবা আদম মসজিদ

বলা হয়, একাদশ শতকে বল্লাল সেনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধে নিহত হন। সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। এরপর চৌদ্দ শতকে বাংলার সুলতান জালাল উদ্দিন ফতেহ শাহর শাসনামলে বাবা আদমের স্মৃতি ধরে রাখতে নির্মিত হয় মসজিদটি।

বিজ্ঞাপন

বিক্রমপুরের ইতিহাস প্রসিদ্ধ রামপাল গ্রামের কাছে দরগাহ বাড়ি গ্রামে অবস্থিত সুলতানি আমলের ছয় মিনারবিশিষ্ট এই মসজিদটির অবস্থান। কিছু দূরেই আছে মাজার, মাজারটি ২৫ ফুট উঁচু বাহুবিশিষ্ট বর্গাকার আয়তনের ইটের তৈরি মঞ্চের ওপর একটি পাকা সমাধি।  

মসজিদের নির্মাণশৈলী আকর্ষণীয়
মসজিদের নির্মাণশৈলী আকর্ষণীয়

মসজিদটি আয়তাকার ভিত্তিভূমির ওপর নির্মিত। উত্তর–দক্ষিণে এর আয়তন ৪৩ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে ৩৬ ফুট। চার কোনায় চারটি অষ্টকোণাকৃতির বুরুজ বা মিনার আছে। মিনার ছাদের কার্নিশের ওপর ওঠেনি। মিনারের ধাপে ধাপে সুন্দর বলয়াকারের রেখায় নকশার কাজ আছে।

বিজ্ঞাপন

পশ্চিম দেয়ালে তিনটি অর্ধবৃত্তাকার মিহরাব আছে। কেন্দ্রীয় মিহরাবের পেছন দিকের দেয়াল বাইরের দিকে বের করা। সামনের দেয়ালের ধনুকাকৃতির খিলানবিশিষ্ট তিনটি প্রবেশপথে আয়তাকারে নির্মিত ফ্রেম আছে। এর ওপরের অংশে খুব সুন্দর কারুকাজ আছে। প্রধান প্রবেশপথের দুই পাশে গভীর সমতল কুলুঙ্গি আছে। উপরিভাগ সুন্দরভাবে খাঁজকাটা। ঝুলন্ত শিকল ও ঘণ্টার অলংকরণ করা। মসজিদে কোনো বারান্দা নেই। ভেতরের দিকে আছে গ্রানাইট পাথরের দুটি স্তম্ভ।

সুলতানি আমলে স্থাপত্য নিদর্শন এই মসজিদ
সুলতানি আমলে স্থাপত্য নিদর্শন এই মসজিদ

ভেতরের অংশ এই দুটি স্তম্ভের সাহায্যে পূর্ব–পশ্চিমে দুই সারিতে এবং উত্তর–দক্ষিণে তিন সারিতে বিভক্ত। স্তম্ভ দুটির মাঝখানে চার ফুট পর্যন্ত অষ্টকোণাকৃতির এবং এরপর ষোলোকোণাকৃতি। এই দুটি স্তম্ভ এবং চারপাশের দেয়ালের ওপর মসজিদের অর্ধবৃত্তাকার ছোট ছোট মিনার ছয়টি স্থাপিত। মিনার ও মসজিদের ভেতরের অংশের মতোই পূর্ব-পশ্চিমে দুই এবং উত্তর-দক্ষিণে তিন সারিতে বিভক্ত। দেয়াল বেশ পুরু।

প্রধান মিহরাব এবং দুই পাশের দুই মিহরাব ও পাশের দেয়াল লতাপাতা, জ্যামিতিক নকশা ও গোলাপ ফুল, ঝুলন্ত প্রদীপ ও শিকল প্রভৃতি অত্যন্ত সুন্দর পোড়ামাটির ফলক দিয়ে অলংকৃত করা। মসজিদের বাইরের দিক বিশেষ করে সামনের দেয়াল অতি সুন্দর পোড়ামাটির ফলক দিয়ে অলংকৃত ছিল। কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের দুই পাশে কিছু কিছু ফলকের কাজ এখনো চোখে পড়ে।

বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে আছে এই মসজিদ
বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে আছে এই মসজিদ

একসময় মনোবাসনা পূরণের জন্য সব সম্প্রদায়ের নারীরা আসতেন। তাঁরা মসজিদের স্তম্ভ দুটি সিঁদুর দিয়ে রাঙাতেন। এ জন্য স্তম্ভ দুটি লালচে হয়ে আছে। মসজিদটি বিভিন্ন নামে পরিচিত—দরগাহ বাড়ির মসজিদ, বাবা আদমের মসজিদ এবং বাবা আদমের দরগাহ।

ভারতবর্ষ প্রত্নতত্ত্ব জরিপ বিভাগ ১৯০৯ সালে একবার মসজিদটি সংস্কার করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। ১৯৯১ সালে লোহার সীমানাবেড়া দেয় বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। সে বছর বাংলাদেশ ডাক বিভাগ বাবা আদম মসজিদের ছবি–সংবলিত একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে।

ছবি: সাগর আহমেদ আরিফ

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ২৩: ০০
বিজ্ঞাপন