শেখ সাইফুর রহমান: হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রিতে আসার কোনো কারণ ছিল কি?
মো. শাখাওয়াত হোসেন: ইচ্ছা ছিল সরকারি চাকরি করার; কিন্তু তখন এটা পাওয়া ছিল বেশ কঠিন। এ জন্যই আমি করপোরেট সেক্টরে কাজ করার কথা ভাবি। সে ক্ষেত্রে আমার প্রথম পছন্দ ছিল দূতাবাস কিংবা পাঁচ তারকা হোটেল। তবে ২০০২ সালে তেমন হোটেল বলতে ছিল শেরাটন ও প্যান প্যাসিফিক। যাহোক, ওই সময়ে আমার পরিচিত একজন হোটেলে বেশ বড় পদে কাজ করতেন; তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করি এববং জানাই, হসপিটালিটি সেক্টরে আমার কাজ করার আগ্রহ।
তবে তাঁর বক্তব্য ছিল, হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম নিয়ে পড়াশোনা করতে পারলে এই সেক্টরে আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করার সুযোগ আছে। আবার আর্থিকভাবেও লাভবান হওয়া যায়। বলা যেতে পারে এটাই ছিল আমার মোটিভেশন।
শেখ সাইফুর রহমান: তখন কী করলেন?
মো. শাখাওয়াত হোসেন: তিনি তখন প্যান প্যাসিফিকে কাজ করতেন। তাঁর সহায়তায় আমি শেরাটনে ব্যাংকোয়েটে পার্টটাইম কাজ করা শুরু করি। এ ছাড়া এনএসটিআই থেকে ট্যুরিজমে দুই বছরের ডিপ্লোমা করতে থাকি। সেটা শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ট্যুরিজম ও হোটেল ম্যানেজমেন্টে এমবিএ করি।
শেখ সাইফুর রহমান: তখনো কি ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করতেন?
মো. শাখাওয়াত হোসেন: আসলে ডিপ্লোমা শেষ করার পর আমি প্যান প্যাসিফিকে ইন্টার্ন হিসেবে যোগ দেই। এর মধ্যে আবার ২০০৭ সালে ওয়েস্টিন ঢাকা প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন সেখানে ফুলটাইম চাকরি পেয়ে যাই।
এই শিল্প খাতে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আগ্রহী বিনিয়োগাকারিরা তো আছেনই। তাদের উৎসাহিত করতে প্রয়োজন বিনিয়োগবান্ধব পলিসি। এ জন্য নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরিবর্তন জরুরি।
শেখ সাইফুর রহমান: এত বছরে এটাই প্রথম ফুল টাইম চাকরি?
মো. শাখাওয়াত হোসেন: হ্যাঁ, তা বটে। এখানে যোগ দিয়ে আমি ধাপে ধাপে হাউসকিপিং থেকে ফ্রন্ট ডেস্কসহ সব অপারেশানাল ডিপার্টমেন্টে কাজ করেছি। পরবর্তী সময়ে ডিপার্টমেন্ট হেড হয়েছি। সেখান থেকে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে পদোন্নতি পাই। তিন বছর জেনারেল ম্যানেজার ছিলাম, আমার সময়ে ওয়েস্টিন সাউথ এশিয়ায় সর্বোচ্চ আয় করে; এর জন্য আমি পুরস্কৃতও হই।
শেখ সাইফুর রহমান: স্টারউডের সঙ্গে ম্যারিয়টের সংযুক্তিকালে আপনার কি কোনো ভূমিকা ছিল?
মো. শাখাওয়াত হোসেন: হ্যাঁ। স্টারউডের সঙ্গে ম্যারিয়টের সংযুক্তির সময়ে বাংলাদেশে আমি নেতৃত্ব দিই।
শেখ সাইফুর রহমান: আপনি তো জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতে পারতেন। বিদেশেও থাকতে পারতেন?
মো. শাখাওয়াত হোসেন: আসলে আমাদের কর্তৃপক্ষ ইউনিক গ্রুপ, বিশেষত এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান চাননি আমি চলে যাই। পরে আমাকে ইউনিক হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্টের প্রধান নির্বাহী হিসেবে নিয়োগ পাই। সে সময় আমি একাধারে শেরাটন হোটেল তৈরির কাজ আর ওয়েস্টিন পরিচালনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব পালন করি। উত্তরায় হানসা নামে আমাদের আরও একটি হোটেল আছে। সেটাও আমার অধীনে আছে।
শেখ সাইফুর রহমান: এর বাইরে আরও কি কোনো হোটেল আছে আপনাদের?
মো. শাখাওয়াত হোসেন: ওয়েস্টিন, শেরাটন আর হানসা—এই তিনটা অপারেশনাল হোটেল। এ ছাড়া আরও চারটা ইনকামিং হোটেল আছে। এগুলো হলো তাজ, বিভান্তা, সেইন্ট রেজিস ও কুয়াকাটা তাজ একজোটিকা।
হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে অনেকের ভ্রান্ত ধারণা বা ট্যাবু আছে। বিশেষত এই খাতকে বলা হয় নারীবান্ধব নয়, নারীদের জন্য নিরাপদ নয়। এই ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বরং আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, এই সেক্টরে মেয়েদের কর্মপরিবেশ অত্যন্ত ভালো। এই ভুল বা নেতিবাচক ধারণা দুর করতে হবে সবাই মিলে। এ জন্য নিয়মিত নানা আয়োজন হতে পারে। প্রচারেরও প্রয়োজন আছে।
শেখ সাইফুর রহমান: এসব হোটেল কবে থেকে কার্যক্রম শুরু করতে পারে?
মো. শাখাওয়াত হোসেন: আশা করছি বেশ তাড়াতাড়িই আমরা এগুলোর কার্যক্রম শুরু করতে পারব।
শেখ সাইফুর রহমান: আপনি তো বোধ হয় বাংলাদেশের হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রিতে প্রথম পেশাদার ব্যক্তি, যিনি পিএইচডি করছেন?
মো. শাখাওয়াত হোসেন: হ্যাঁ, তা বলতে পারেন। তবে এর আগে আমি এই বিষয়ে এমফিল করেছি। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে খন্ডকালীন ফ্যাকাল্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি; একই সঙ্গে চলছে আমার গবেষণাও। এসবই আমি করছি আমার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি। এই সমান্তরাল ভূমিকা বোধ হয় আমি একমাত্র পালন করছি বাংলাদেশে। এ ছাড়াও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও সাউথ ইস্ট ইউনিভার্সিটিতে পড়িয়েছি ফ্যাকাল্টি হিসেবে। রিজ কার্লটনে কাজ করার ইচ্ছা ছিল। এটা বাংলাদেশে নেই। আমি একদম ছোট থেকে কাজ শিখে এত দূর এসেছি। বাইরে চলে গেলে হয়তো হতো। কিন্তু দেশে থাকায় হয়নি। তবে বাংলাদেশে সেইন্ট রেজিস আসছে। সেটা আমার তত্ত্বাবধানেই থাকবে। আর এই হোটেল রিজ কার্লটনের সমমানের। ওয়েস্টিনের পাশেই হচ্ছে সেইন্ট রেজিস ঢাকা। বলা যেতে পারে, বাংলাদেশে এটাই প্রথম কোনো সাততারকা হোটেল।
আসলে হোটেল ম্যানেজার বাংলাদেশি হবে, বিদেশি হবে না—এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে হোটেল মালিকদের।
শেখ সাইফুর রহমান: বাংলাদেশে যে হোটেলগুলো আছে, সেগুলো কি আসলেই পাঁচ তারকা মানের?
মো. শাখাওয়াত হোসেন: পাঁচ তারকা আসলে দুই ধরনের হয়ে থাকে। এক. যাদের আন্তর্জাতিক হোটেলের সঙ্গে কোলাবরেশন আছে বা চেইন হোটেল; যেমন ওয়েস্টিন, প্যান প্যাসিফিক, ইন্টারকন্টিনেন্টাল, শেরাটন ইত্যাদি। দুই. সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়েছে যেমন ‘সারিনা’। এদের বলা হয় স্ট্যান্ড অ্যালোন ফাইভ স্টার। এরাও ভালো করে, ভারতের তাজ হোটেল বা লীলা হোটেল হচ্ছে এ রকম পাঁচ তারকা হোটেল। তবে মান নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের দেশে বেশ কঠিন।
শেখ সাইফুর রহমান: আমাদের হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রি বেশ আগে থেকে শুরু হলেও শেখানোর জন্য তেমন কোনো ভালো ইনস্টিটিউট গড়ে ওঠেনি। এখনো দেশের বাইরে থেকে ম্যানেজার আনা হয়। তাঁরা মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে যান। এ রকম হওয়ার কারণ কী?
মো. শাখাওয়াত হোসেন: আসলে হোটেল ম্যানেজার বাংলাদেশি হবে, বিদেশি হবে না—এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে হোটেল মালিকদের। যেমন ধরুন সৌদি আরবে একই পদে একজন বিদেশি তিন বছরের বেশি থাকতে পারে না। এই তিন বছরের মধ্যে তিনি ওই দেশের কর্মীদের কাজ শিখিয়ে যান, যাতে করে তিনি চলে যাওয়ার পর সেই কাজ ওই কর্মী করতে পারেন। তবে এটাও ঠিক, আমাদের দেশের হোটেলমালিকদের একটা মনোভাব হলো বিদেশি কাউকে ম্যানেজার করতে হবে, হোটেলের কর্মী আর অতিথিদেরও মনোভাব অভিন্ন। ওয়েস্টিনের মালিক একজন মুক্তিযোদ্ধা। দেশের প্রতি তাঁর অন্য রকম টান থেকেই তিনি এই দায়িত্বে একজন বাংলাদেশিকেই রেখেছেন। আবার আমাদের প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন, আমরা যখনই এমন পজিশনে চলে যাই, এক রকমের অহংকার চলে আসে। আমরা কর্মীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করি না, হোটেলমালিকদের সেভাবে সম্মান করি না, নানা রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ি। বিদেশিদের ক্ষেত্রে সেটা দেখা যায় না।
শেখ সাইফুর রহমান: ইউনিক গ্রুপ হসপিটালিটি খাতে ভালো কাজ করছে। তাহলে ইনস্টিটিউট নিয়ে আপনারা ভাবছেন না কেন?
মো. শাখাওয়াত হোসেন: আমাদের ইনস্টিটিটিউট আছে। মানে আমাদের একটা কলেজ আছে। কিন্তু দক্ষ হোটেলিয়ার গড়ে তুলতে যে মাপের প্রশিক্ষক দরকার, সেটা নেই। তবে আমরা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের স্কুল করতে চাই। এখানে বলে রাখি, স্টারউডের প্রেসিডেন্ট দিলীপ পুরী কিন্তু সুইজারল্যান্ডের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অ্যাফিলিয়েট করে ইন্ডিয়ান স্কুল অব হসপিটালিটি প্রতিষ্ঠা করেছেন; এই ধরনের উদ্যোগ আমাদের এখানেও নেওয়া সম্ভব। বাংলাদেশে দেখা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পলিটিক্যাল সায়েন্স, ইতিহাস এসব বিষয়ে পড়ছে কিন্তু হোটেল ম্যানেজমেন্টের বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী বিষয় নিয়ে পড়ে না। অথচ এসব বিষয়ে পাস করলেই চাকরি পাওয়া যায়। আমাদের ছেলেমেয়েদের এসব বিষয় নয়, আগ্রহ দেখা যায় গৎবাঁধা বিষয়ে। এই মনোভাবের পরিবর্তন আনতে হবে। অনেকেই হয়তো হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রির নানা বিষয়ে পড়েন, কিন্তু পড়া শেষে কোথায় কাজ করবেন, সেটা বুঝতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে হোটেলিয়ারদেরও ইতিবাচক হতে হবে। তাহলেই এই শিল্প খাতে অগ্রগতি হবে। কয়েক বছর ধরে আমি ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস কমিটির মেম্বার। আইএসসি ট্যুরিজিম, ইন্ডাস্ট্রি স্কিল কাউন্সিল যা এনএফডিএর অন্তর্ভুক্ত; সেখানে আমাকে পরিচালক করা হয়েছে। ট্যুরিজম বোর্ডের ট্যুরিজম মাস্টারপ্লান কমিটির সদস্যও। এখানে বলা প্রয়োজন, এসব প্রতিষ্ঠানে আমাকে একা রাখলে হবে না, আরও যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদেরও রাখতে হবে। তাঁরা সম্পৃক্ত হলে, তাঁদের দায়িত্ব বেড়ে যায়; তাঁরা আরও বেশি ইতিবাচকভাবে কাজ করেন। এই ইন্ডাস্ট্রির একটা ভালো দিক হলো, এখানে উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সার নানা ভূমিকায় কাজ করা সম্ভব, যেটা অন্য পেশায় হয় না। আর কেবল যে বাংলাদেশে কাজ করতে হবে না; বরং এই খাতের দক্ষ জনশক্তি দেশের বাইরে গিয়েও কাজ করতে পারবে। এতে দেশেরই উপকার হবে। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতিকে আরও বেগবান করবে। অন্যদিকে, তখন আর কেবল শ্রমিক ভাইদের রেমিট্যান্সের ওপর কেবল নির্ভর করতে হবে না। এসব নিয়ে আসলে আমাদের নীতিনির্ধারক আর সরকারকে গভীরভাবে ও গুরুত্বসহকারে ভাবতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে হবে। আমি মনে করি, পর্যটন খাতের দায়িত্বে এমন ব্যক্তিদের থাকা উচিত যাঁরা এই খাত সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখেন, ব্যবসা সম্পর্কে ধারণা রাখেন। অথচ বাস্তবে হয় এর উল্টো। এটই বোধ করি এই খাতের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় অন্তরায়।
শেখ সাইফুর রহমান: আমাদের এখানে এখন বিশ্বিবিদ্যালয়গুলোতে তো বটেই, অনেক কলেজ আর ইনস্টিটিউটটে হসপিটালিটি ও ট্যুরিজম বিষয়ে পড়ানো হয়। এদের কি কোনো আন্তর্জাতিক অধিভুক্তি আছেন?
মো. শাখাওয়াত হোসেন: আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের অ্যালামনাই। ঢাকার সাতটি বেসরকারি কলেজে টুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট পড়ানো হয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৪টি কলেজে পড়ানো হয়। এছাড়া এক শর বেশি ইনস্টিটিউটে পড়ানো হয়। অথচ দেখেন কোথাও কোনো আন্তর্জাতিক অধিভুক্তি নেই। এমন কি যা পড়ানো হয় সেটা মানসম্পন্ন কি না, তা–ও যাচাই করা হয় না। অথচ এটা একান্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশের পর্যটন বলতে গেলে শুরু থেকে একই অবস্থানে থেকে গেছে। ইনস্টিটিউটগুলোতে এন্ট্রি লেভেলের ট্রেনিং থাকলেও, মিড লেভেলের কোনো ট্রেনিং নেই। সেটাও শুরু করা প্রয়োজন। আসলে কষ্টটা কোথায় হয় জানেন, এত সম্ভাবনাময় একটা সেক্টর নিয়ে আমাদের কোনো গুরুত্ব নেই। অথচ কেবল সম্ভবনাময়ই নয়, ক্রমবর্ধমান এই শিল্প খাত। এখানে যে কেউ কাজ শুরু করলে ১০ বছরের মধ্যেই ভালো ফল পাবে। প্রচুর অর্থ উপার্জনের পথ খুলে যাবে তরুণদের। এ জন্যই আমরা অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডের একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি আমাদের ইনস্টিটিউটের অ্যাফিলিয়েশনের জন্য। আমরা নতুনভাবে শুরু করতে চাই। কারণ, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের পেস্ট্রি শেফ বা অন্যান্য শেফ অনেক বেশি নেই। ফলে বাইরে থেকে না এনে উপায়ও থাকে না। এই শূন্যতা পূরণ করতে হবে। ভোক্তার সন্তুষ্টি সব ক্ষেত্রেরই পূর্বশর্ত। আর এই ইন্ডাস্ট্রিতে ভোক্তাই অতিথি। এ জন্য অতিথির সন্তুষ্টি নিশ্চিত করাকে আপনি কীভাবে দেখেন? অসাধারণ সার্ভিসের কোনো বিকল্প নেই। আমার কাছে এই ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে পছন্দের বিষয় হচ্ছে কাস্টমার স্যাটিসফেকশন; যা প্রত্যেক হোটেলিয়ারের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত। কারণ, গ্রাহক খুশি থকার মানে সবকিছু ঠিক আছে। এখানে পরিবেশ, পরিবেশনা, সেবা, খাবার, কর্মীদের আচরণ ইত্যাদি সব ঠিকঠাকমতো হলেই কিন্তু অতিথি বা ভোক্তা খুশি হন। এটাই মুখ্য।
শেখ সাইফুর রহমান: এই ইন্ডাস্ট্রির একজন হিসেবে আপনার কোনো বিশেষ পরামর্শ কি আছে?
মো. শাখাওয়াত হোসেন: আমি বা আমরা চাই আমাদের সেবার মাধ্যমে অতিথিদের অবস্থান বা উপভোগ কিংবা উদযাপনকে সুন্দর ও স্মৃতিময় করে দিতে। সেটা করতে পারলেই অতিথিরা মনে রাখবেন; রাখেনও। প্রকৃতপক্ষে, একজন অতিথিকে খুশি হতে দেখা, আনন্দিত হতে দেখার চেয়ে সুন্দর কিছু হতে পারে না। একে বলা হয় ‘ট্রিপ পারসোনা’।
শেখ সাইফুর রহমান: আপনি দুটো হোটেলের দায়িত্বে আছেন। সেখানকার কর্মীদের সম্পর্কে এবং পরিচালন ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাই।
মো. শাখাওয়াত হোসেন: ওয়েস্টিন ও শেরাটনে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁরা সবাই তরুণ। আমাদের রেভিনিউ আশাব্যঞ্জক; কারণ আমরা আশানুরূপ সেবা নিশ্চিত করি। কীভাবে আমরা আমাদের অতিথিদের সন্তুষ্ট করতে পারি সেটা নিয়ে নিয়িমত কাজ করি। এমনকি তাঁরা যেন ঘরের বাইরে দ্বিতীয় আবাস হিসেবে আমাদের প্রপার্টিকে বিবেচনা করেন, সেটা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখি। একটু বলে রাখি আমার এমফিলের বিষয় ছিল: ভোক্তা সন্তুষ্টি। ফলে আমি জানি কীভাবে অতিথিকে সন্তুষ্ট করতে হয়। সেভাবেই পরিকল্পনা করি।
শেখ সাইফুর রহমান: আমাদের দেশের হোটেল ব্যবসা কীভাবে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে?
মো. শাখাওয়াত হোসেন: হোটেল বিজনেসের বেশির ভাগ জিনিস, এই যেমন ফার্নিচার, খাবারের উপকরণ, আনুষঙ্গিক উপকরণ, এমনকি মানবসম্পদ দেশের বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। সে ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের কর, শুল্ক ও ভ্যাট দিতে হয়। যার পরিমাণ অনেক বেশি। এই কর, শুল্ক ও ভ্যাট সহনীয় মাত্রায় রাখা হলে আরও বেশি রাজস্ব অর্জন করা সম্ভব হবে। যেটা দেশের অর্থনীতির জন্যও ভালো হবে। এই শিল্প খাতে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আগ্রহী বিনিয়োগাকারিরা তো আছেনই। তাদের উৎসাহিত করতে প্রয়োজন বিনিয়োগবান্ধব পলিসি। এ জন্য নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরিবর্তন জরুরি।
শেখ সাইফুর রহমান: এছাড়া আর কারা এখানে ভূমিকা রাখতে পারে। কিভাবে এই ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে ভুল ধারণা দুর করা যেতে পারে?
মো. শাখাওয়াত হোসেন: হোটেল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত একাডেমিশিয়ান, প্র্যাকটিশনার ও মিডিয়াকর্মীরাও এখানে তৎপর ভূমিকা রাখতে পারেন। অন্যদিকে, হসপিটালিটি খাতের বিভিন্ন পেশায় আসতে আগ্রহীদের আস্থা বাড়াতে হবে। কারণ, কোনো সন্দেহ নেই এই খাত ক্রমবর্ধমান ও নিরাপদ। এখানে অনৈতিক কিছু না করলে পদোন্নতি নিয়মিত হয়। অনেক সুযোগ–সুবিধাও পাওয়া যায়।
এ ছাড়া হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে অনেকের ভ্রান্ত ধারণা বা ট্যাবু আছে। বিশেষত এই খাতকে বলা হয় নারীবান্ধব নয়, নারীদের জন্য নিরাপদ নয়। এই ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বরং আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, এই সেক্টরে মেয়েদের কর্মপরিবেশ অত্যন্ত ভালো। এই ভুল বা নেতিবাচক ধারণা দুর করতে হবে সবাই মিলে। এ জন্য নিয়মিত নানা আয়োজন হতে পারে। প্রচারেরও প্রয়োজন আছে। (চলবে)
ছবি: তানভির আহমেদ ও ওয়েস্টিন