দেশের বাইরের উন্নত চিকিৎসায় পাশেই আছে মেডিএইডার
শেয়ার করুন
ফলো করুন

সাব্বির আহমেদ তামিম পেশায় ছিলেন একজন ব্যাংকার। ২০১৮ সালে হুট করেই আক্রান্ত হন হৃদ্‌রোগে। প্রায় দেড় মাস হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে চিন্তা করেন দেশের বাইরে গিয়ে আরেকবার চেকআপ করানোর। সেই চিন্তা থেকেই ভারতে যাওয়া। সেখানে পৌঁছে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন নিজে। কোন রোগের জন্য কোথায় যেতে হবে, সেটা জানা না থাকলে সমস্যায় পড়তে হয়। মধ্যস্থতাকারী অনেক সময় ঠকায়। বাংলাদেশ থেকে অনেকেই উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। সঠিকভাবে না জানলে প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দেশের মানুষের উপকার করতেই একটা উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবেন। বিশেষ করে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া মানুষকে সঠিক পরামর্শ দেওয়া এবং পুরো প্রক্রিয়াকে আরও সহজতর করাই ছিল উদ্দেশ্য। এরপর ২০১৯ সালে শুরু করেন ‘মেডিএইডার’।

সম্মাননা গ্রহণ করছেন সাব্বির আহমেদ (মাঝে)
সম্মাননা গ্রহণ করছেন সাব্বির আহমেদ (মাঝে)

ব্যাংকে বেশ ভালো বেতনে চাকরি করতেন, সেটা ছেড়েই শুরু করেন এ প্রতিষ্ঠান। চাকরি ছাড়ার সুবাদে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা পেয়েছিলেন। সেই টাকা দিয়েই তখন সংসার চালিয়েছেন। শুরু করেই পড়েন বাধার মুখে। করোনা অতিমারিতে সবাই তখন ঘরবন্দী। তখন টেলি–কনসালটেশন ও ভিডিও কনসালটেশনের  মাধ্যমে মানুষকে বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়ার কাজ করেছে মেডিএইডার, খুবই সাশ্রয়ী মূল্যে মাত্র ১০০ টাকায়। এ ছাড়া বাড়িতে সেবাদায়ী পৌঁছে দেওয়া, অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়া, করোনা রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি সব কাজের মাধ্যমে চেষ্টা করেন মানুষের আস্থা অর্জন করতে।

বিজ্ঞাপন

সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘করোনার পর মানুষ যখন আবার ভ্রমণ শুরু করল, আমরা আবার মানুষকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য কনসালটেন্সি দেওয়ার কাজ শুরু করলাম। আমাদের উদ্দেশ্যই ছিল কম লাভে মানুষের জন্য ভালো সেবা নিশ্চিত করা। কেউ আমাদের মাধ্যমে না গেলেও তাঁকে যেন আমরা সঠিক পরামর্শটা দিতে পারি। বিগত পাঁচ বছরে ১০ হাজারের বেশি রোগীকে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েছি এবং আড়াই হাজারের বেশি রোগীকে চিকিৎসার ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছি। এখন আমরা ভারত, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও দুবাই—এই ছয়টি দেশের জন্য চিকিৎসাসেবার পরামর্শ এবং ভিসা প্রসেসিং ও বুকিংয়ের সব কাজ করে থাকি। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের মধ্যে চোখের চিকিৎসা ও হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা পরামর্শের কাজ বিভিন্ন হাসপাতালের সঙ্গে আমরা কাজ করে থাকি।’

সেবা প্রদানের জন্য মেডিএইডারে আছে দক্ষ কর্মীবাহিনী
সেবা প্রদানের জন্য মেডিএইডারে আছে দক্ষ কর্মীবাহিনী

মেডিএইডার গড়ে ওঠা প্রসঙ্গে সাব্বির আহমেদ তামিম বলেন, ‘২০১৫  সালে আমেরিকাভিত্তিক একটি সংগঠন “ফাউন্ডারস ইনস্টিটিউট” উদ্যোগ তৈরির প্ল্যাটফর্মে সাড়ে তিন মাসের একটা ট্রেনিং করি। শেখ শায়ের হাসান সেই ট্রেনিং করান। মেডিএইডার প্রতিষ্ঠার আগে তাঁর সঙ্গেই এই প্ল্যাটফর্মের বিষয়ে আলাপ করলে তিনি এটাকে খুব ভালো একটা উদ্যোগ হতে পারে বলে উৎসাহিত করেন। তিনি বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন আর আমি ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে আছি। আমাদের লোগোর থিমটিও সেই ধারণাকে ভিত্তি করেই তৈরি। আমরা মানুষের সেবা চাই।’

বিজ্ঞাপন

কীভাবে নির্বাচন করা হয় কোন রোগীর জন্য কোন চিকিৎসা বা চিকিৎসক সঠিক হবে?
এ প্রসঙ্গে সাব্বির আহমেদ জানান, তাঁদের একটি ডক্টর’স পোল আছে। রোগীরা কোন দেশের কোন হাসপাতালে যেতে চান, কোন চিকিৎসক কোন রোগের জন্য ভালো—তেমন একটি তালিকা তৈরি করে সেই অনুযায়ী উপযুক্ত চিকিৎসকের পরামর্শ দেওয়া হয়। কোনো রোগী এলে তাঁর কাছ থেকে এখানকার চিকিৎসকদের চিকিৎসা বিবরণী, নানা পরীক্ষা–নিরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে ডক্টর’স পোলে পাঠানো হয়। সেখান থেকে নির্বাচন করা হয় ওই রোগীর নির্দিষ্ট চিকিৎসক ও হাসপাতাল। তিনি বলেন, ‘তাঁদের আমরা বলেও থাকি, “আপনার ব্যক্তিগত পছন্দের কোনো হাসপাতাল থাকলে আমাদের জানান।” আবার অনেক সময় রোগীরাই তাঁদের জন্য আমাদের হাসপাতাল সাজেস্ট করতে বলেন।

মেডিএইডারে মেলে বিদেশে চিকিৎসা সংক্রান্ত নানা পরামর্শ
মেডিএইডারে মেলে বিদেশে চিকিৎসা সংক্রান্ত নানা পরামর্শ

পরবর্তীকালে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, ভিসা প্রসেসিং, হাসপাতাল ও হোটেল বুকিংসহ যাবতীয় প্রক্রিয়া আমরা করে দিই। ইতিমধ্যে আড়াই হাজার রোগী বিভিন্ন দেশ থেকে চিকিৎসা নিয়ে এসেছেন। তাঁরা তাঁদের  অভিজ্ঞতা আমাদের জানিয়েছেন। এভাবেও তাঁদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ভালো হসাপাতালগুলো সম্পর্কে জানতে সক্ষম হয়েছি।’

কেন রোগীরা দেশের বাইরের চিকিৎস করতে চান?  কীভাবে আপনারা সহায়তা করে থাকেন?

এ প্রসঙ্গে সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেক রোগের চিকিৎসা নেই। যেমন বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট, লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট ইত্যাদি। আবার ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য সাধারণত দেশের বাইরে যেতে চান রোগীরা। আমরা আসলে প্রয়োজন ও চাহিদামতো হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরীক্ষা–নিরীক্ষাসহ সবকিছুতে ডিসকাউন্টের ব্যবস্থা, এয়ারপোর্ট থেকে আনা–নেওয়াসহ যতটা সম্ভব সাশ্রয়ী খরচে রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করে থাকি। রোগীরা তাঁদের সামর্থ্য অনুযায়ী কোন দেশে যাবেন, তা নির্ধারণ করেন।’

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে সাব্বির আহমেদ তামিম জানান, বর্তমানে ঢাকা ছাড়াও চটগ্রামে তাঁদের অফিস আছে। এ ছাড়া সিলেট, রাজশাহীসহ অন্যান্য জেলা শহরে টেলিফোন ও ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে পরামর্শ ও কাউন্সেলিং করা হয়ে থাকে। আমাদের পরিকল্পনা আছে সব বিভাগে আমাদের অফিস করার, যাতে আমরা মানুষের পাশে থাকতে পারি। কারণ, এ সেক্টরে কেবল ব্যবসায়িক লাভের কথা চিন্তা করলে হবে না, মানুষের সেবার কথাও ভাবতে হবে। বিগত পাঁচ বছরে কাজ করতে গিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। একবার এক রোগী ক্যানসার চিকিৎসার জন্য যান। তিনি নিজে থেকেই দামি হাসপাতাল নির্বাচন করেন। তিনি মারা যান। বিল হয় ২২ লাখ রুপি। তখন তাঁর পরিবার থেকে পরামর্শ চায়। আমরা কথা বলে ১২ লাখে রফা করি। আর ভদ্রমহিলাকে বলে দিই এর বেশি না দিতে। যেহেতু তাঁর স্বামী বেঁচে নেই। এভাবে আমরা রোগী ও তাঁদের পরিবারকে নানাভাবে সহায়তা দিয়ে থাকি।’

এসব কাজের জন্য রোগীদের কাছে মেডিএইডারের আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে। সাব্বির আহমেদ তামিম বলেন, ‘মালদ্বীপে হেলথ ইনস্যুরেন্স আছে। তাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকেই রোগীদের জটিল রোগের জন্য বাইরের হাসপাতালে পাঠানো হয়। তাদের বিমা কোম্পানিই পুরো দায়িত্ব পালন করে। আমাদের দেশে এটা নেই, বরং দেশের বাইরের চিকিৎসাকে নিরুৎসাহিত করা হয়। এ ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারনী পর্যায়ে এ বিষয়কে বিবেচনায় রাখতে হবে। কারণ, সব রোগে না হলেও জটিল রোগের ক্ষেত্রে বাইরে যেতে হতে পারে। আর চিকিৎসা ক্ষেত্রে অন্যান্য খাতের মতো ভর্তুকি  খুবই প্রয়োজন।’

বিভিন্ন সময় বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে মেডিএইডার পেয়েছে স্বীকৃতি
বিভিন্ন সময় বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে মেডিএইডার পেয়েছে স্বীকৃতি

মেডিএইডার থেকে সার্ভিস পায় নুসরাত জাহান। তিনি একটি করপোরেট অফিসের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান। তিনি জানান, ২০১৮ সাল থেকে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে ভুগছেন। অনেক চিকিৎসা করিয়েও ফল পাচ্ছিলেন না। দেশের বাইরে যেতে চাইলেও একা যেতে ভরসা পাচ্ছিলেন না তিনি। পরে তিনি অবশ্য দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করানোর ক্ষেত্রে সব ধরনের সহায়তা পান মেডিএইডারের। চিকিৎসাসেবায় মাল্টিডিসিপ্লিনারি চিকিৎসকদের প্যানেল অনেক গুরুত্বপূর্ণ, যা আমাদের দেশে সেভাবে কার্যকর নয়।

একটি দুর্ঘটনায় হাত ভেঙে যায় মবিনুদ্দিন আহমেদ জুয়েলের। দেশে আশানুরূপ চিকিৎসা না পাওয়ায় মেডিএইডারের মাধ্যমে তিনি ভারতে গিয়ে চিকিৎসা নেন। সেখানের চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর হাতে তেমন কোনো সমস্যাই নেই। এসব কারণেই মানুষ দেশের বাইরে যায় চিকিৎসার জন্য। আশা করা যায়, এ সমস্যার সমাধান হবে।

ছবি: মেডিএইডার

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৪, ১১: ২৬
বিজ্ঞাপন